Thursday, February 21, 2019

একজন স্বপ্নযাত্রী: ইতিহাস, বাস্তবতা ও হাস্যরসের মিশেল

ছোটবেলার ভাদাইম্মা ফরিদ যখন কালের প্রবাহে ল্যাংটা বাবা রূপে তুর্যের সামনে আবির্ভূত হয় তূর্য তখন হতভম্ব হয়ে যায়। তার এই মুখোশহীন ভণ্ডামির কারণ জানতে চাইলে গোপনে বলে, “কী করুম ভাইজান - পুরো দেশটাইতো এহোন ল্যাংটা। একটু চোখ বুইজা ভাবলে অন্তরচক্ষু দিয়া হেই ল্যাংটা লেবাস আমনেও দেখতে পাইবেন। আমাগো দেশের রাজনৈতিক নেতারা তো অনেক আগেই দেশটারে বেশ্যা বানাইয়া রাখছে। যে যার মতো কইরা ভোগ করে।”

এটুকু পড়েই বুঝা যায় লেখকের রাষ্ট্রের প্রতি অনুরাগ। পুরো উপন্যাসেই লেখক নিজের কথাগুলোকে চরিত্রের মুখে বুলি হিসবে ফুটিয়ে তুলেছেন। বর্তমান রাষ্ট্রের দিকে তাকালে হয়তো যেকেউই এটা দেখতে পাবে।

তবে এই দায়ভার কি শুধুই রাষ্ট্রের নেতাদের নাকি সাধারণ জনগণের চরিত্রেও সমস্যা আছে? সেটাই বলছেন অন্যখানে । "মানুষ ও পশুর মধ্যে যেমন ভালোবাসা বিনিময় হয় তেমনি চরিত্রেরও বিনিময় হয়। কোনো কোনো সময় মানুষ পশুর চরিত্র ধারণ করে।"

সবচেয়ে যেটা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সেটা হল বেকারত্বের আর্তনাদ। লেখক কখনো সুনিপুণভাবে তুলে এনেছেন বেকারদের আশ্রয়স্থল মেস লাইফের হাসি কান্নার উপাখ্যান যা তার নিজের জীবন থেকেই নেয়া নির্দ্বিধায় বলা যায়। নয়তো এতো সূক্ষ্ণ বর্ণনা কল্পনা থেকে টেনে আসা প্রায় অসম্ভবই বলা চলে।

"আমাদের দেশে আবার মানুষের নাম তার কর্মের উপর ভিত্তি করে বিকৃত হয়ে যায়। অফিসের বড় কর্তাকে আমরা রহিম সাহেব বললেও ঘরের কাজের ছেলের নাম হয় রহিম্মা।" 

বর্ণনায় কখনো কখনো মুন্সিয়ানাও দেখিয়েছেন। দাড়োয়ানের স্যালুট দেয়ার বর্ণনায় লিখেছেন, "দাড়োয়ান তড়িঘড়ি করে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বাম পা-টা একটু সামনে টেনে ডানহাত কপালে ঠেকিয়ে, ডানপা উঁচুতে উঠায়ে মুহূর্তেই সে পা ফ্লোরে ফেলে দাড়াম করে শব্দসহকারে স্যালুট করে।"

উপন্যাসে আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার চরিত্রকে আরো বাস্তব করে তোলে। দাড়োয়ানকে উপন্যাসের নায়ক তূর্য যখন তার স্যার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে তার উত্তর ছিল, 'আরেহ মিয়া আমাগো মতো লমা-ছমারে কি বড় সাহেবরা অইসব কইয়া যায়।' জন্মসূত্রে ভোলার বাসিন্দা হওয়ায় ভোলার আঞ্চলিক ভাষাটাকেই তিনি বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছেন উপন্যাসে। সেই শব্দভান্ডারের কলসি থেকে ঢাকনা তুলে তা উম্মুক্ত করে দেন সবার জন্য।

উপন্যাসটি এই কারণে আরো গুরুত্বপূর্ণ যে এখানে একটি পুরাণ ঢাকার একটা বাস্তব ইতিহাস তুলে ধরেছেন। আশি নব্বইয়ের দশকে যখন এই টাইটানিকসম জাহাজ, জিরাফের মতো মাথা উঁচু করা ভবন এতোটা জনপ্রিয় হয় নি তখন সদরঘাটে ভাসমান হোটেল ছিল। তার উপন্যাসের শুরুতেই সেই ইতিহাস ফুটে ওঠে পাঠকের কাছে। আমার কাছে এই তথ্য আগে সম্পূর্ণ অজানা ছিল।

আগের উপন্যাসগুলো পড়ার সুবাদে বলতে পারি লেখকের ভেতর দেশপ্রেম প্রগাঢ়। তিনি সবকিছুর উর্ধ্বে দেশপ্রেমকে স্থান ছেড়ে দেন।

উপন্যাস থেকে দুটো লাইন কোট করে দিতে চাই পাঠকদের জন্য।
"আসার সময় শাঁখারি বাজার কালি মন্দিরে পুজো দিয়ে আসলেন চান্দুলাল কাকা তূর্যের নামে মানতের। ভালোবাসার কোনো দেশ কাল পাত্র ধর্ম হয় না। ভালোবাসাকে কেবল একটি নিয়ামকেই মাপা যায় আর সেটা হল ভালোবাসা।" এটা আমার কাছে দারুণ লাগছে। চান্দুলাল চরিত্রটাকে এক কথায় বলা যায় মানবতার ফেরিওয়ালা।

আরেকটি কোট  হল-
"পুলিশে দিলে আমিও ওগোরে কইয়া দিমু দোকানে কোন কোন মালের লগে ভেজাল মিশাইয়া মাল বেচেন। তখন বুঝবেন আমি বড় চোর নাকি আপনি!" ফরিদের উক্তি। ফরিদ বাধ্য হয়েই খারাপ পথে হাঁটে। মেসের খরচের জন্য চুরি করে সে। কিন্তু সে চুরি তার কাছে মালিকের চুরির তুলনায় সামান্যই মনে হয়।

পুরো উপন্যাসটাই নায়কের কল্পনার ভেতরে ঘুরপাক খেয়ে যখন শেষ হবে তখন পাঠকের মাথায়ও ঘুরপাক খাবে।
"একদিন একরাতে করেছি প্রেমের সাথে খেলা
একরাত একদিন করেছি মৃত্যুরে অবহেলা।
একদিন একরাত তারপর প্রেম গেছে চলে
সবাই চলিয়া যায় সকলের যেতে হয় বলে।"

পাঠ শেষে এটুকুই বলবো, লেখক নিজের সাথে নিজেই প্রতিযোগিতা করে দিনদিন উতরে যাচ্ছেন। আরো সময় এবং ধৈর্য নিয়ে লিখলে হয়তো আরো ভালো লেখনী পাবে পাঠক। ঔপন্যাসিকের জন্য শুভ কামনা।

উপন্যাস: একজন স্বপ্নযাাত্রী
লেখক: মাহববু-উল-আলম চৌধুরী
প্রকাশনী : ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ
প্রকাশকাল : ২০১৯ বইমেলা

রাজীব নন্দী
২১-০২-২০১৯

Sunday, January 6, 2019

গণবিবাহতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান


অনুচ্ছেদ (১-১৪)
........................................
১. এই সংবিধানের মূলমন্ত্র হইবে—আমার বিবাহ আমি করিব, যাহাকে খুশি তাহাকে করিব।

২. পাত্রীর পিতা সম্প্রদায়ের উদ্দেশে বলা হইল—চাহিবামাত্র আপনার বিবাহযোগ্য মেয়েকে বিবাহ দিতে বাধ্য থাকিবেন।

৩. ‘সরকারি পাত্র ব্যতীত আমার কন্যা বিবাহ দিমু না, প্রয়োজনে ঘরের পিলার বানাইয়া রাখমু’—পাত্রীদের প্রতি পিতা সম্প্রদায়ের এরূপ ছেলেমানুষী কথাবার্তা বলা হইতে বিরত থাকিতে হইবে। মনে রাখিতে হইবে, বেসরকারি পাত্রদেরও বাচ্চা হইয়া থাকে।
'
৪. একজন বেকার ছেলে বিবাহের কথা বলিলেই মুরব্বিরা সমস্বরে গাহিয়া ওঠেন, ‘বিয়া কইরা খাওয়াবি কী?’ বউ মানেই খাদক প্রাণি—এরকম উদ্ভট ধারণার পরিবর্তন করিবার নিমিত্তে অতি জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে হইবে।

৫. বেকারদের জন্য ‘গণবিবাহতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার’ 'ম্যারেজ ব্যাংক' কিংবা 'ব্রাইডাল ব্যাংক' নামে ব্যাংক খুলিয়া সেইখান হইতে লোন লইয়া বিবাহ করিবার পথ সুগম করিবার পদক্ষেপ গ্রহণ করিবে।

৬. সভ্যতা টিকাইয়া রাখিবার মূল হাতিয়ার হইল জনগণ। তাই এই সংবিধান অনুযায়ী অন্যান্য মৌলিক চাহিদার মতো বিবাহকেও মৌলিক চাহিদা হিসেবে ঘোষণা করা হইলো।

৭.  অনেক পুরুষ একটিমাত্র বিবাহ সম্পন্ন করিয়া দমিয়া যায়, ফুলদানিতে ভিজাইয়া রাখা ফুলের মতো নিস্তেজ হইয়া পড়ে। অতি শীঘ্রই এর সঠিক কারণ জানিয়া তাহা সংস্কার করিবার যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করিবে।

৮. বিবাহের নামে মেকআপ বিজনেস, ফটোশ্যুট বিজনেস, সেলফি ডিজিজের মাত্রা দিনদিন বাড়িয়াই চলিতেছে। সময় থাকিতে এইসবের লাগাম টানিয়া ধরিতে হইবে।

৯. যৌতুকের নাম করিয়া দিনে-দুপুরে কোট-প্যান্ট পরিধান করিয়া সকলের চর্মচক্ষুর সম্মুখে ভদ্রবেশে ডাকাতি বন্ধ করিতে হইবে।

১০. বিবাহের রাতে মেয়েপক্ষের ঘাড়ে হাজার হাজার অতিথি সেবন করাইবার প্রথার নামে লুটপাট বন্ধে সুশীল সমাজের মুখের ঠুসি খুলিয়া এর বিরুদ্ধে কথা বলিতে হইবে।

১১. বিবাহের পর হনলুলু, পাতায়া কিংবা যেকোনো জায়গায় হানিমুন করিবার সম্পূর্ণ খরচ 'গণবিবাহতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার'কে বহন করিবে। তবে বাচ্চার দায়ভার পাত্র-পাত্রীই নিজেদেরই বহন করিবে।

১২. যেইদিন বাচ্চার ওয়া ওয়া ক্রন্দন ধ্বনিতে চারদিক মুখরিত হইয়া উঠিবে, সেইদিন হইতে ওই দম্পতির 'গণবিবাহতন্ত্রী বাংলাদেশ সংবিধান' অনুসারে ‘নব-দম্পতি’ তকমা বাতিল বলিয়া গণ্য হইবে।

১৩. বিবাহই জীবনের সব। জীবনে প্রচুর বিবাহ করিতে হইবে। তাই বিবাহ-পাগলা সমাজের জন্য এই স্বতন্ত্র ‘গণবিবাহতন্ত্রী বাংলাদেশ সংবিধান’ ঘোষণা করা হইল।

১৪. পরিশেষে মনে রাখিতে হইবে, বিয়ে যতই হউক না কেন, সন্তান যেন একটির বেশি না হয়। কারণ বিবাহের দায়িত্ব গণবিবাহতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের কিন্তু সন্তানের দায়িত্ব যার যার।

©রাজীব নন্দী
প্রকাশিত: ঠাট্টা | ইত্তেফাক
৬-০১-২০১৯ সংবিধান

Tuesday, July 24, 2018

একটা জীবন নাহয় কেটে যাক তীব্র হাহাকারে

প্রিয় শ্রাবণ,
তুমি কি মনে মনে আমার সাথে হুট করে দেখা হয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকো? কলেজের রিসেপশন দিয়ে ঢুকতে ঢুকতে কি কখনো মনে হয় না তোমাকে এক পলক দেখার জন্য আমি ভোর সাতটায় গিয়ে ওখানটায় বসে ছিলাম? নাকি আমার উপস্থিতি তোমায় বড্ড বিরক্তর জন্ম দেয়। বিরক্ত হতে হতে এতোদিনে তোমার বিরক্তির উপরও মায়া হওয়ার কথা।

যাক সে সেসব কথা।  শ্রাবণ মাসে একটা শ্রাবণপত্র না লিখলে ঠিক যেন হচ্ছে না তাই অনেকদিন পর তোমায় লিখতে বসলাম। এটা তোমায় লেখা আমার এগার নম্বর পত্র। জানি আগের একটিও তুমি পড়ো নি। আমার লেখা তোমার পড়াটা জরুরিও নয়। এ তল্লাটে তুমি পা না ফেলার যে ব্রত গ্রহণ করেছো সেটা অটুট রাখো তোমার অহমিকার মতোই। তোমার ইগোর প্রাচীরে যেন বিন্দুমাত্রও ফাটল না ধরে সেদিকে কড়া নজর রেখো। দেয়ালের ওপারে কি ঘটলো সেসব তোমার কখনোই জানার বিশেষ প্রয়োজন নেই।

আমার দ্বিতীয় সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা চলে। বারো তারিখ পরীক্ষার পর আবার পনের তারিখ পরীক্ষা ছিল। মাঝের এই দু-দিন আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ হেয়ালিপনা বোধহয় করেছি আমি। নিজেকে একটিবারও জিজ্ঞেস করি নি আমি ভুল সঠিক  কিছু করছি কিনা। আমার মন বলছে যাও অামি ছুটে গিয়েছি সেথায়। মন নামক ইঞ্জিনের সাথে শরীর নামক বগিটা লাগিয়ে দিয়েছি মাত্র। আমি জানি এসবের বিন্দুসম গুরুত্বও তোমার কাছে নেই। বারো ঘন্টা পাড়ি দিয়ে তোমায় তিন ঝলক দেখতে পেরেছি এটাই সান্ত্বনা।

আমাদের যে দিন গেছে তা কি একেবারেই গেছে? নাকি কিছু আছে অবশিষ্ট। কথার নিগরে বানানো কথামালা কি একেবারেই মূল্যহীন হয়ে গেছে? ভালোবাসার প্রতিশ্রুতি নিয়ে যে গোলাপ কিনে আনে সে তো বেলাশেষে শুকিয়ে পড়ে থাকে ধুলোয়। আমিও কি তেমন একটা গোলাপ ছিলাম?  ভায়োলিনের সুমধুর সুর কেবল সংগীতের বাহবাই পায় ওটা যে তার করুণ আর্তনাদ সেকথা সবাই বেমালুম ভুলে যায়। আমি কি সুরের ছদ্মনামে সে আর্তনাদ ছিলাম?

যাক গে সেসব কথা। কালো ড্রেস পরে সামনের সিঁড়িতে তোমায় বসা দেখে আমার কলিজা ছিঁড়ে যেতে বসেছিল। নিজের কপালকে কেবল অভিসম্পাত দিতে লাগলাম, ভেতরটা যার জন্য ছিঁড়ে যাচ্ছে করুণ আর্তনাদে সে দেবি স্বয়ং আমার সামনে বসা অথচ তিনি আমার নয়। নোনা জলের চিহ্নে যার জন্য বালিশে লেগে আছে, সে আমার নয়। যাকে একবার দেখার জন্য আমি সাতবার পৃথিবী প্রদক্ষিণ করতে পারি, সে আমার নয়। যাকে চিৎকার করে ভালোবাসি বলতে বলতে নিজের ভোকাল কর্ডের উপর অত্যাচার করতে পারি, সে আমার নয়। যে কখনো ভালোবাসে নি তাকে এই অনুভূতি কখনোই বুঝানো যাবে না। কোনো গল্প সিনেমা দেখিয়েও শেখানো যাবে না। এটা ঠিক অন্য জগতের একটা অনুভূতি। আমি যতবারই ভাবি সে আমার নয় আমার ভেতরে ভেতরে যেন ততবারই আমি মরে যাচ্ছি, দুমড়ে মুচড়ে যেন নিমিষেই ভেঙ্গে পড়ি আমি। আবার দাঁড়াই। শেষ করে দেয়া মানে তো ভালোবাসা নয়।

শ্রাবণ, আমাকে কখনো ভালোবাসতে হবে না। আমি চাই তুমি শুধু এটুকু বুঝো যে কেউ একজন উম্মাদ হয়ে যায় তোমার কথা ভেবে। তুমি শুধু জানো কেউ একজন সত্যি সত্যি তোমাকে ফিল করে, তোমায় ভেবে ভেবে কারো শরীরে প্রচণ্ড গরমেও কনকনে শীতের কাঁপুনি দেয়। তুমি নিজেকে লুকিয়ে রাখো, আড়াল করে রাখো আজীবনের জন্য কিন্তু আমায় কেবল এই মানসিক শান্তিটা দাও যে তুমি জানো কেউ একজন তোমায় ভালোবাসে। তার ভালোবাসাটাকে তুমি গ্রহণ করতে না পারো অসম্মান করো না। তাকে ফিরিয়ে দেয়ার ক্ষমতা তুমি রাখো কিন্তু তাকে অপমান করার ক্ষমতাটা তুমি হারিয়ে ফেল ভালোবাসার দোহাইয়ে এটাই চাই।

একটা জীবন না হয়  কেটে যাকতীব্র হাহাকারে। না পাওয়ার আর্তনাদ ছটফট করুক আমার ভেতর। অনুভূতি ফ্রেমবন্দি করার সিস্টেম থাকলে আমি আমার এই অনুভূতিটা বন্দি করে রাখতাম। আমি ভয়ে তোমার কাছে যাই না তোমার কোনো কটু কথায় যদি আমার এই ডিভাইন অনুভূতিতে ক্ষয় ধরে আমি কি সেটা পুনরুদ্ধার করতে পারবো কি?  বৃদ্ধ বয়সে হাতে লাঠি নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে যখনি আমার মহারাণীর কথা মনে পড়ে চোখের কোনে অশ্রধারা বইবে সেটাই হবে আমার ভালোবাসার জয়। আমি বুঝবো ভালোবাসা মানে পাশাপাশি থাকাই নয়, পাশাপাশি অনুভব করার সক্ষমতা।

যাক। লিখতে থাকলে একটা উপন্যাস হয়ে যাবে। ভালো থেকো। নববধূর শাড়ির ভাঁজের মতো, তোমার কপালের কালো টিপের মতো, তোমার যত্ন করে আগলে রাখা ইগোর মতো। এতক্ষণ শুধু  একাই বকে গেলাম। তোমার সম্পর্কে কিছু জানতেই চাই নি। কখনোই ফের উত্তর আসবে না জাতি তবুও জানতে ইচ্ছে হয়।  এখন তুমি কেমন আছ শ্রাবণ?

- কেউ একজন
২৪-০৭-২০১৮

চুমু উপাখ্যান


- চুমু বিদ্যাকে ইংরেজিতে বলে philematology আর চুমু খেতে বড্ড ভয় পাওয়াকে বলে  Philematophobia

- কারো কপালে চুমু খাওয়া মানে আপনি তার বুদ্ধিমত্তার প্রশংসা বুঝায়।

- কারো গালে চুমু খাওয়া মানে তার রূপের প্রশংসা করছেন।

- কারো চিবুকে চুমু খাওয়া মানে তার কোনো কাজকে সমর্থন করা।

- কারো নাকে চুমু খাওয়া মানে ভীরুতা ।

- কারো হাতে চুমু খাওয়া মনে তুমি তাকে নিয়ে ভীষণভাবে ভাবো এবং হারানোর ভয় পাও সবসময় এটাই প্রকাশ পায় ।

- কারো ঠোঁটে চুমু খাওয়া ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।

- সল্প সময়ের জন্য চুমু খাওয়া মানে আপনি একটা হুদাই কেয়ারলেস পারসন।

- বিয়ের পর বর এবং কনে প্রথম দেখায়ই যদি চুমু খায় তবে তাদের দাম্পত্য জীবন সুখী হবে বলে মনে করা হয়।

- বিয়ের পর কনে প্রথমে যে লিঙ্গের শিশুকে চুমু খাবে তার প্রথমে সে লিঙ্গের শিশু হবে বলে অনেকেই বিশ্বাস করে।

- কোনো পুরুষকে চুমু খাওয়ার পর যদি আপনার মুখে তার গোঁফ আবিষ্কার করেন তবে আপনি শেষ জীবনে অনেক কষ্ট পেয়ে মারা যাবেন বলে অনেকেই মনে করে।

- কোনো মৃত বন্ধুকে চুমু খেলে আপনী সাহসী হয়ে উঠবেন।

- যদি কেউ তার মৃত স্বামী বা স্ত্রীকে চুম্বন করে তবে সে খুব শিঘ্রই বিয়ে করতে যাচ্ছে।

©রাজীব নন্দী

Wednesday, July 4, 2018

ডাক্তার মানেই কি ডাকাত?

....কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে হঠাৎ জিন্স প্যান্টের ডান পকেট থেকে ফোনটা বের করে একজনকে ফোন দিল। বিশ থেকে ত্রিশ মিনিটের মধ্যে একদল লোক এসে হাজির হাসপাতালের সামনে। কারো হাতে লাঠি, কেউ গেট থেকে ঢুকেই এদিক সেদিক তাকাচ্ছে সুবিধাজনক কিছু পায় কিনা! হঠাৎ ঔদ্ধত্য হয়ে সামনে থাকা লোকটি বলে উঠল,
শালা কসাই, রোগীকে রোগী মনে করে না। মনে করে একেকটা ব্যবসায়ী পণ্য। কই শালার চেম্বার কই?
দাঁড়া। আগে আমার কাছ থেকে কাহিনি শুনে তারপর চিল্লাপাল্লা করিস। ডাক্তাররা সম্ভবত এক জোট হয়েছে এবং পুলিশকেও ফোন দিতে পারে। তুই আরো লোক খবর দে। আজকে ওর ডাক্তারি শিখাই দিমু ভালো মতো। বলেই লোকটি ভেতরে চলে গেল। 

....বাতাসে ফোনের রিং ভেসে যাচ্ছে আর লোকজন আসতেছে। চারপাশে লোকজন কানাঘুষা করতেছে, একজন আরেকজনকে জিজ্ঞেস করতেছে কীভাবে মারা গেল, জোয়ান নাকি বুড়া, বাড়ি কই রোগীর। উত্তর পেয়ে কিংবা না পেয়ে ডাক্তারকে গালি দিয়ে ক্ষান্ত হচ্ছে।

....হাসপাতালের সামনে ছোটখাটো একটা ঈদের হাটের মত জমায়েত হয়ে গেছে। ব্লাড প্রেসার বেড়ে যাচ্ছে উপস্থিত জনতার। সবার চোখে মুখে এমন ভাব যেন ডাক্তারের সাথে আগের জন্মের কোন শত্রুতা ছিল। রোগীর আত্মীয় স্বজন প্রায় সবাই ইতোমধ্যে ঘটিবাটি ফেলে হাজির হাসপাতালের সামনে। ভেতরে ঢোকার জন্য সবাই হুলুস্থুল শুরু করে দিয়েছে কিন্তু দরজা ভেতর থেকে লক করা।

....হঠাৎ হ্যান্ডমাইক মুখের সামনে ধরে বের হয়ে আসল সেই লোকটি যে প্রথমে ফোন করেছিল। উপস্থিত জনতার চোখে মুখে রহস্য খেলা করছে। মাইক থেকে বলতে লাগলেন, "আপনাদের মাঝে ও নেগেটিভ ব্লাড আছে কার একটু হাত তুলুন।"

থার্টি প্লাস একজন হাত তুলল। তাকে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হল।
তারপর মাইকে বলা হল, "সকাল থেকে অনেক খুঁজে রক্ত পাওয়া যাচ্ছিল না, রোগীর অবস্থা খুবই সঙ্কটাপন্ন তাই মিথ্যা কথা বলতে হল। সবার কাছে সরি চেয়ে নিচ্ছি।"

....সবার মুখে বিরক্তির ছাপ ফুটে উঠল। কেউ কেউ নিচুস্বরে গালি দিয়ে প্রস্থান করতে লাগল। মনে হল কোন ব্লক বাস্টার সিনেমা দেখার জন্য টিকেট কেটে সিনেমা হলে ঢুকেছে কিন্তু যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে শো টি বাতিল করা হল।

© রাজীব নন্দী

শুভ জন্মদিন হার্টলেস কার্ডিওলজিস্ট 2018

রাত ১২:০১ মিনিট। অনেক ভেবেচিন্তে তার নাম্বারে ডায়াল করলাম। রিং হচ্ছে আর আমার ভেতরটা ধুরুধুরু করছে। হার্টবির্ট কন্ট্রোলে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করে যাচ্ছি তবুও। আমি জানি ফোনটা কখনোই রিসিভ হবে না। আমাকে খাটিয়ায় করে কবরের দিকে নিয়ে যাওয়ার সময় যদি কেউ একজন আমার ফোন থেকে আমার মৃত্যু সংবাদ জানানোর জন্য এই নাম্বারে কল করে তবুও ফোনটা রিসিভ হবে না, আসবে না কোনো রিভার্স কলও।

তবুও মিছে ভাবনা ভেতরে আকুলিবিকুলি করে চলছে। ও ফোন রিসিভ করলে আমি কী বলবো। আমার গলা দিয়ে কি কথা বেরুবে। আমি কথা গুলিয়ে ফেলবো না তো। নাকি কথা বলতে গেলে স্বপ্নের মতো আমাকে বোবায় ধরবে। ভাবতে ভাবতেই দুটো কলের সমাপ্ত হলো। ফোন রিসিভ হলো না।

আচ্ছা, ও কি আমার কলটা দেখেছে। নাকি ফোনটা ওর কাছেই ছিল না। নাকি আমার নাম দেখেই ফোনটা হাতে তুলে রিংটোন সাইলেন্ট করে আবার ফোনটা রেখে দিয়েছে। আমার নাম্বার দেখে কি ও বিরক্ত হয়েছে নাকি প্রথম উইশ করার এই পাগলামো দেখে ঠোঁটের কোনে মুচকি হাসি মেখে ফোন রাখতে রাখতে অজান্তেই বলে উঠেছে, পাগল একটা।
জানি না। আমি এসবের কিচ্ছুই জানি না। আমার ভাবনায় তবুও আমি সব মিশিয়ে নিয়েছি। যেভাবে ভাবনায় মিশে আছে এক পাক্ষিক ভালোবাসার গল্পটা। একটা গল্প ডালপালা ছড়ানোর জন্য কতো আর্তনাদ করে যাচ্ছে। প্রসব বেদনার অবসান ঘটিয়ে বাস্তবে বেড়ে উঠতে চাচ্ছে। কেবল তার গুটিয়ে নেয়া হাত সবকিছু নাখোস করে দিচ্ছে।

ইদানিং বড্ড অসুখ করে আমার। ভেতরে ভেতরে কুঁকড়ে উঠি। থেমে থেমে। রুদ্র গোস্বামীকে জিজ্ঞেস করতেই তিনি বলে দিলেন আমার অসুখের কথা।
"গা পোড়েনি, জ্বর নয়, তবুও বিস্বাস মুখ
আমাকে পেয়ে বসেছে তোমাকে দেখার দীর্ঘ অসুখ।"
কি ভয়াবহ ব্যাপার। বিজ্ঞানের এই যুগে আমার অসুখ সারানোর মতো কোনো ডাক্তার নেই।

জানি কেউ অপেক্ষা করে না আমার উইশের জন্য। কারো পাহাড়সমান ইগো কখনোই পরাজিত হবে না। তবুও সে নাহয় জেতার দলেই থাকুক, আমি বেহায়ার হয়েই বলি...
"শুভ জন্মদিন হার্টলেস কার্ডিওলজিস্ট"
ভালোবাসায় থেকো, ভালোবাসায় রেখো।
ওহ হ্যাঁ.. শুধু আমার এবং আমাকে।

একজন নূরে আলম

গতরাতে লঞ্চে বরিশাল থেকে ঢাকা আসার সময় মোশাররফ করিমের একটা নাটক খুুব মনোযোগ দিয়ে দেখেছিলাম। নূরে আলম। জ্যোতিষী এই নূরে আলমের হাত দেখে বলেছিল, সামনের জৈষ্ঠ্য মাসের এক তারিখ তার সাথে সময়ের ব্যস্ততম অভিনেত্রী নায়িকা অপি করিমের বিয়ে হবে। সে জাস্ট অপি করিমকে গিয়ে বললেই হবে, "হে অপি করিম আমি তোমার হবু স্বামী নূরে আলম তোমাকে বিয়ে করার জন্য চলে আসছি।" অপি করিম তাতেই রাজি হয়ে যাবে।
বেচারা নূরে আলমের সাদা মনে কাদা নাই। প্রথমে সিনেমা হলে গেলেন। সেখানকার লোকজন বললেন, অপি করিম এফডিসিতে থাকেন। এলেন এফডিসি। তাকে দাড়োয়ার ঢুকতেই দিচ্ছে না। বহু কষ্টে অপি করিমের বাসার ঠিকানা খুঁজে বাসায় এলেন হাতে ফুলের তোড়া আর গিফট নিয়ে। তার সরল বিশ্বাসে কেনা সে ফুলের তোড়া দাড়োয়ার ছুঁড়ে ফেলে দিলেন রাস্তায়।

নূরে আলম নাছোড়বান্দা। জ্যোতিষী বলেছে মানে এটা সত্যি। অপি করিমের বাসার সামনে ব্যানার টানিয়ে সেখানে লিখে রাখলেন, ‘অপি করিম, আমি নূরে আলম তোমার স্বামী। তোমাকে বিয়ে করার জন্য চলে এসেছি। সে ব্যানারও ভস্ম হয়ে গেল দিয়াশলাইয়ের আগুনে। পুলিশ দুবার অ্যারেস্ট করে নিল তবুও কাজ হল না। সবাই মোটামুটি ভেবে নিয়েছে সে পাগল।

তারপর অপি করিমের বাসার সামনে অনশন শুরু করলেন। বৃষ্টিও তাকে বাসার গেটের সামনে থেকে সরাতে পারে নি। অবশেষে অপি করিমের মনে হল তারসাথে কথা বলা দরকার। তাকে ভেতরে ডাকলেন। তিনি যে বিবাহিত এবং জ্যোতিষী যে তাকে মিথ্যে বলেছে এটা বুঝিয়ে বললেন নূরে আলমকে। বিশ্বাসের ব্রিজ ভেঙ্গে যাওয়া নূরে আলম কাঁদো কাঁদো চোখে বাসা থেকে আনা রুমালে প্যাঁচানো আংটিটা বের করে অপির হাতে দিয়ে প্রস্থান করলেন।

নূরে আলমের এই আবেগ, এতো অনুভূতি কিছুই তাকে স্পর্শ করতে পারে নি। কেবল সেই নূরে আলমের মৃত্যু সংবাদ অপি করিমকে ছুৃঁতে পেরেছে। তার মনে হয়েছে তিনি অপরাধী। তবে কি স্রেফ ভালোবেসেই কাউকে আপরাধী করা যায়?

আমাদের হয়তো কোনো জ্যোতিষী না বলে দিলেও সবার জীবনেই বোধহয় একজন অপি করিম থাকে যাকে পাওয়ার জন্য আমরা মরিয়া হয়ে উঠি। পৃথিবীর সব নিয়মকে উপেক্ষা করে আমাদের ভেতরের নূরে আলম নাছোড়বান্দা হয়ে ওঠে। কিন্তু আমাদের জীবনটা ক্যামেরার সামনে রোল করা ফিল্ম নয়, তাই আমরা চাইলেও অনেক কিছু করতে পারি না। কেবল নীরবে ভালোবাসার মানুষটাকে ভেতরে ধারণ করতে পারি। এটাই বা কম কী!

- রাজীব নন্দী
৪-৭-২০১৮